![]()
ইলিয়াস হোসেন, এক সময়কার উদীয়মান সাংবাদিক, এখন তিনি আলোচিত ইউটিউব আর ফেসবুকে। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই তার নানা আলোচনা সামনে আসে। তিনি নিজেকে দাবি করেন বাংলাদেশ পন্থী হিসেবে, সেই সাথে ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধেও তার কট্টর অবস্থান।
কেবল সেখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশে সম্প্রতি দুটি গণমাধ্যমে যে ভাঙচুর আর অগুন দেয়ার ঘটনা ঘটানো হয়, সেখানেও প্রকাশ্যে মদদ দিয়েছেন তিনি। ইলিয়াস দাবি করেন, বাংলাদেশে তিনি কোনো ভারতীয় আধিপত্যের চিহ্ন রাখবেন না।
ইলিয়াস আরও একটা কারণে পরিচিত, তিনি কেবল শালীন ভাষার সমালোচনা নয় বরং আশালীন ভাষাতেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বেশ পটু। যারা ইলিয়াসের ভিডিও নিয়মিত দেখেন, তাদের আছে ইলিয়াসের কিছু বিশেষ শব্দের সাথে পরিচয়ও।
ইলিয়াসের কন্টেন্ট অনেকের কাছেই বোমার মতো শক্তিশালী৷ কেউ কেউ তাই একে বলে থাকেন ভিডিও বোমা।
এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, ইলিয়াস হোসেন আসলে কি? কি তার পরিচয়? কোন রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন তিনি?
ইলিয়াসের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কিছুটা ধন্ধে পড়ে যেতে পারেন যে কেউ। শেখ হাসিনার আমলে তিনি ভারতপ্রীতি আর স্বৈরাচার তকমা দিয়ে নিয়মিত আওয়ামী লীগকে তুলোধুনো করতেন। আবার হাসিনা পতনের পর তিনি বিএনপিরও ধুন্ধুমার সমালোচনা করেছেন, করছেন। বিশেষ করে বিএনপির কিছু বিশেষ নেতাকে সুযোগ পেলেই ধুয়ে দেন ইলিয়াস। বরাবরই জামায়াত তার কাছে কিছুটা ছাড় পেয়ে আসছে। কিন্তু একটা পত্রিকার সম্পাদকের সাথে সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে, জামায়াতকেও বিশেষ ভাষায় ধোলাই করেন ইলিয়াস।
ইলিয়াসের এমন কাণ্ডে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, কেউ তাকে বলেন সাহসী সাংবাদিক, কারো কাছে তিনি জাতীয় বীরের পর্যায়ে, কেউ তার কথাকেই বাইবেল মানেন। তার শোনানো ইতিহাসকে মানেন চির সত্য। তাদের মতে, ইলিয়াস হোসেন ভারত বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা।
তবে উল্টো দাবিও আছে, অনেকের কাছেই ইলিয়াস এটেনশন সিকার। বিশেষ রাগ মেটাতেই তিনি কাজে লাগান তার ভক্তদের। আবার কখনো করেন, ডলার কামানোর ধান্ধা।
যদিও ইলিয়াস নিজেকে বরাবরই বাংলাদেশপন্থী, ভারতবিরোধী আর জুলাই আন্দোলনের অন্যতম রূপকার হিসেবেই হাজির করতে চান। তার দাবি মতে, তিনি ভারতের রাহুগ্রাস থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে চান।
ইলিয়াস মনে করেন, শেখ হাসিনার আমলে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিলো কেবলই দাসত্বের, বেইনসাফি আর বৈষম্যের। ভারত শুধু নিজের আখের গুছিয়েছে, বাংলাদেশ পায়নি কিছুই। আওয়ামী লীগ ভারত প্রীতি ছাড়লে, দলটির অফিসে নিয়মিত হাজিরা দেয়ার কথাও বলেছিলেন ইলিয়াস।
ইলিয়াসের শুরুটা ছিলো টেলিভিশনে। তারপর নানা ঘটনা চক্রে তাকে দেশ ছাড়তে হয়। বিদেশে বসেই তিনি ভিডিওকে হাতিয়ার করেন। রাতারাতি তার এই ভিডিও বোমায় অনেকের টনকও নড়ে, অনেকে কিছুর ফল আবার উল্টোও হয়।
ইলিয়াস হোসেন একসময়কার বাংলাদেশি টেলিভিশন সাংবাদিকতার সুপরিচিত মুখ। উপস্থাপনার মধ্য দিয়েই তার যাত্রা শুরু, নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা।
চুয়াডাঙ্গায় জন্ম ইলিয়াস হোসেনের। ১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া এই সাংবাদিক ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন টেলিভিশনের স্ক্রিনে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার। শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-তে অংশ নিয়েই প্রথম আলোচনায় আসেন তিনি। সেখানকার অভিজ্ঞতা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের দিকনির্দেশনা দেয়।
পেশাগত জীবনে পা রাখার পর টেলিভিশনেই সুযোগ খুঁজতে থাকেন ইলিয়াস। প্রথম উপস্থাপনার সুযোগ পান চ্যানেল ওয়ানের ‘গুড মর্নিং বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে। যদিও সে সময়ে খুব বেশি আলোচনায় আসতে পারেননি, কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। এরপরই তার জীবনে আসে বড় সুযোগ। যোগ দেন একুশে টেলিভিশনে এবং শুরু করেন জনপ্রিয় অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘একুশের চোখ’-এর উপস্থাপনা। এ অনুষ্ঠানই তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। নাটকীয়ভাবে তিনি জনপ্রিয়তা পান, হয়ে ওঠেন দর্শকদের আস্থার মুখ। সেই সময়কার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বছরের সেরা উপস্থাপক নির্বাচিত হন তিনি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট থেকেও পুরস্কার অর্জন করেন।
তবে জনপ্রিয়তা তাঁকে যেমন আলোচনায় এনেছে, তেমনি এনেছে বিতর্কেও। ২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর ‘একুশের চোখ’-এ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচারের পর শুরু হয় জটিলতা। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইলিয়াসসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। আইনি জটিলতা ও চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
দেশ থেকে দূরে থাকলেও থেমে থাকেননি ইলিয়াস। ইউটিউবকে হাতিয়ার করে আবারও দর্শকের কাছে ফিরে আসেন। ‘ইলিয়াস হোসেন’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করে গড়ে তুলেছেন লক্ষাধিক দর্শকভিত্তি। রাজনৈতিক এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তাঁর ‘15 Minutes’ অনুষ্ঠানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। তবে অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। গোলাম মাওলা রনি, জ্যাকব মিল্টন ও নিরু নীড়া প্রসঙ্গসহ বেশ কিছু ভিডিও নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়; কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে আইনের মুখোমুখিও হতে হয়।
২০২৪ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর আত্মসমর্পণ ও গ্রেপ্তার প্রসঙ্গ নিয়েও দেশজুড়ে গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল, যদিও পরে বিষয়টি ভুয়া বলে জানা যায়।
তবে শেষ দেশের বড় দুইটি গণমাধ্যমে ব্যাপক হামলার ঘটনার পর রিমুভ করা হয় ইলিয়াস হোসেনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ইউটিউবেও রেসটিকশনে পড়েন তিনি। সবমিলিয়ে, প্রশংসা কুড়ানো ইলিয়াস সমানতালে কুড়াচ্ছেন সমালোচনাও।
